গাজায় ইসরায়েল হামলাকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই বছর ধরে চলা দীর্ঘমেয়াদি বয়কটে ভুগছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ব্যবসা পরিচালনাকারী মার্কিন ফাস্টফুড ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। এ সংকটে ক্ষতির মুখে পড়েছে স্টারবাকস, পিৎজা হাট ও কেএফসির মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ড। একদিকে যেমন বিক্রি কমেছে, তেমনি পতন ঘটেছে ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনাকারী কোম্পানির শেয়ারদরে। সব মিলিয়ে মার্কিন ফাস্টফুড ব্র্যান্ডগুলোর অনেক আউটলেট বন্ধ হয়ে গেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ দুটিতে।
নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুসারে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোম্পানিগুলো স্থানীয় গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও আর্থিক ক্ষতি সামাল দেয়ায় বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্র্যান্ডগুলো বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। স্টারবাকস মালয়েশিয়া স্থানীয় বারিস্তাদের (কফি পরিবেশনকারী) তৈরি পানীয় নিয়ে ‘রাহসিয়া বারিস্তা’ নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছে। কোম্পানির সিগনেচার পণ্যের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের ডিজাইন করা টেডি বিয়ার বিক্রি করছে এবং মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় একজন শেফের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্থানীয় খাবার মেনুতে যুক্ত করেছে।
অন্যদিকে পিৎজা হাট দাম কমিয়ে মাত্র ৫ রিঙ্গিতের পিৎজা অফার করছে এবং ম্যাকডোনাল্ড’স মালয়েশিয়া তাদের স্থানীয় মালিকানা ও কর্মী নিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছে।
বয়কটের প্রভাবে কিছু কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নতুন শাখা খোলার পরিকল্পনাও বাতিল করছে। স্টারবাকস ইন্দোনেশিয়ার লাইসেন্সধারী ম্যাপ ভোগা আদিপেরকাসা তাদের নতুন আউটলেট খোলার সংখ্যা বছরে ৭০-৮০টি থেকে কমিয়ে মাত্র ১০-১৫টিতে নামিয়ে এনেছে।
মালয়েশিয়ার বাজারে স্টারবাকসের অপারেটর বার্জায়া ফুডের আয়ে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) কোম্পানির আয় কমেছে ১৮ শতাংশ এবং লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৭২ লাখ রিঙ্গিতে। একই সঙ্গে চলতি বছরের এখন পর্যন্ত বার্জায়া ফুডের শেয়ারদর ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে কেএফসি ও পিৎজা হাট মালয়েশিয়ার অপারেটর কিউএসআর ব্র্যান্ডস গত বছরের মুনাফা থাকলেও এখন লোকসানে রয়েছে।
অবশ্য ইন্দোনেশিয়ায় কিছু ক্ষেত্রে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সেখানে পিৎজা হাট অপারেটর সারিমেলাতি কেনকানার শেয়ারের দাম চলতি বছর ৬৬ শতাংশ ও কেএফসির অপারেটর ফাস্ট ফুড ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারের দাম ১১ শতাংশ বেড়েছে। সারিমেলাতি কেনকানা চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরে এসেছে। ফাস্ট ফুড ইন্দোনেশিয়া লোকসানে থাকলেও ক্ষতির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় কমেছে। আর্থিক অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে কোম্পানি সম্প্রতি একটি স্থানীয় পোলট্রি ফার্মে নিজেদের ১৫ শতাংশ অংশীদারত্ব বিক্রি করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ব্র্যান্ড বয়কটের কারণে স্থানীয় ও অন্যান্য এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সামের এলহাজ্জার জানান, বয়কট যত জোরালো হবে, চলমান সংকট তত দীর্ঘ হবে। যা উদীয়মান জাপানি ও দক্ষিণ কোরীয়সহ এশীয় ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের বাজার অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য একটি মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত হতে পারে। অর্থাৎ পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো যখন চাপের মুখে থাকবে, তখন স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো গ্রাহকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারবে।
তবে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি এমএআরএর কমিউনিকেশন বিভাগের অধ্যাপক আজিজুল হালিম ইয়াহিয়া মনে করেন, ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য শেষ হয়ে গেছে এবং গ্রাহকরা এখন কেবল অর্থের মূল্যের দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। অন্যদিকে মালয়েশিয়ান ব্যবসায়ী ফরিদজুল আশরাফের মতে, বয়কট হাজার হাজার স্থানীয় কর্মীকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা এর উদ্দেশ্য ছিল না। এ ভিন্নমতগুলোই বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর ভবিষ্যৎকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে।